শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০২:২৯ অপরাহ্ন

একুশের বাণী :
দৈনিক একুশের বাণী একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা , আমরা দীর্ঘ ২০ বছর যাবৎ সুনামের সহিত দেশের প্রত্যেকটি প্রান্ত থেকে মুহুর্তের খবর এনে তুলে ধরি আপনাদের সামনে , বর্তমানে আমরা ২০১৮ থেকে অনলাইন বার্সনেও আছি , আগামী ১০ দিনের মধ্যে ই-পেপারেও চলে আসবো । আমাদের তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করুন , সত্য-তা যত গভিরেই থাকুক , জাতির সামনে তুলে আনবো আমরা । আমাদের ইমেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ- dailyekusherbani2013@gmail.com/dailyekusherbani2018@gmail.com ... মোবাইল বার্তা বিভাগঃ- 01635757744 গভ,রেজি নং- ডিএ-২০৩৫। বর্ষ-20
শিরোনাম :
ঝিনাইদহে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯শিক্ষকের খোঁজ নেই গাজীপুরে আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম এর পথসভা অনুষ্ঠিত অবৈধভাবে শত বছরের গাছ কাঁটার নিরাপদ জায়গা এখন ঝিনাইদহের হরিশংকরপুর অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশেই ‘ইভ্যালি’ খুলেছিলেন রাসেল! ফিনল্যান্ড পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী মহানগরের বোর্ড বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকলীগের পথসভায় কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তিন বছর পূর্তি উদযাপন তৃতীয় দিনের ‘রুদ্ধদ্বার’ বৈঠকে বসেছে বিএনপি ভাঙ্গায় খামারীদের মাঝে মিল্ক ক্রিম সেপারেটর মেশিন সামগ্রী বিতরণ গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৫১ জনের মৃত্যু,নতুন শনাক্ত ১৮৬২ জনের। শিল্পকলা একাডেমী ইউএসএ’র “প্রবাস প্রত্যয়ে বঙ্গবন্ধু” শীর্ষক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কাল দীর্ঘ যানজটে যশোরের বেনাপোল বন্দরবাসী ইসলামপুরে মহিলা মাদরাসা শিক্ষার্থী নিখোঁজ ঘটনায় ৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলায় জেল হাজতে প্রেরণ ভাঙ্গায় পৌর নির্বাচনে প্রার্থীদের সাথে প্রশাসনের মতবিনিময় নবীনগর আইন শৃঙ্খলা সভায় ১১৫ টি দূর্গাপূজা মন্ডপের ঘোষণা মাওনা চৌরাস্তা মানবিক ও আধুনিক সমাজের উদ্যোগে নিকলী-হাওরে আনন্দ ভ্রমণ নরসিংদীর মনোহরদীতে বিষপানে কৃষকের আত্মহত্যা কুমিল্লা আদালতে প্রধানমন্ত্রী ছবি অবমাননা করায় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কর্তৃক মানববন্ধন করোনা সুরক্ষায় চা বাগানের শিক্ষার্থীদের মাঝে সাউথ এশিয়া রেডিও ক্লাবের মাস্ক ও সাবান বিতরণ ইউনেস্কো ক্লাব চট্টগ্রাম জেলার ৩য় সাধারণ সভা সম্পন্ন
মুহররম মানে আহলে বাইতের রক্তে রঞ্জিত দ্বীন ইসলাম

মুহররম মানে আহলে বাইতের রক্তে রঞ্জিত দ্বীন ইসলাম

মুফতী মাসুম বিল্লাহ নাফিয়ী
উমাইয়া শাসক মুয়াবিয়া ইবনে আবী সূফিয়ান মৃত্যুর পূর্বেই সাইয়্যেদিনা ইমাম হাসান রাঃ-ও মুয়াবিয়ার মধ্যে যে চুক্তি ছিলো, মুয়াবিয়া সে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে স্বীয় পুত্র ইজিদকে তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে ক্ষমতায় বসান। ৬৮০ সালে মুয়াবিয়া ইন্তেকাল করলে এজিদ সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন রাঃ কে তার প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার ও বৈশ্যতা স্বীকার করতে বলে। সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন রাঃ এজিদের নিকট আনুগত্যের বিষয়টি অস্বীকৃতি জানান। একই সময় ঘটনাক্রমে তিনি ৬০ হিজরীতে নিরাপদে থাকার কথা চিন্তা করে মক্কার উদ্দেশ্যে মদিনা ত্যাগ করেন। এরই মধ্যে কুফার লোকজন ইমামের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সাহায্য প্রার্থনাসহ তার প্রতি তাদের আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দেন। ইমাম তাদের কথার প্রতি আস্তা রেখেই আত্মীয়স্বজন ও কিছুসংখ্যক অনুসারীসহ একটি ছোট কাফেলা নিয়ে কুফার অভিমুখে যাত্রা করেন। কিন্তু কারবালার নিকট যাওয়ারপর ইয়াজিদের সেনাবাহিনী কাফেলাটির পথরোধ করে। বিধাতার রহস্যময় পরিক্ষায় ৬৮০ সালের ১০ই অক্টোবর (১০ মুহররম ৬১ হিজরী) কারবালায় সংঘটিত হয় অতর্কিত নৃশংস সংঘাত। লড়াইয়ের একপর্যায় এজিদ বাহিনী সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন ইবনে আলী রাঃ শিরশ্ছেদ করে। সংঘাতে আহলে বাইতের পরিবারের সদস্যসহ ৭২ জন শহীদ হন। এমনকি ইমামের ছয় মাসের বাচ্চা সাইয়্যেদিনা ইমাম আলী আসগরও শহীদদের একজন। এজিদের নিষ্ঠুর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ থেকে মহিলা এবং শিশু কেউই রক্ষা পায়নি। যুদ্ধবন্দী হিসেবে ধরে নিয়ে যায় সাইয়্যেদিনা ইমাম জয়নাল আবেদীন রাঃ কে। বিশেষ করে সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইনের মৃত্যুতে সৃষ্ট ক্রোধ একটি বেদনাদায়ক ক্রন্দনে রূপান্তরিত হয়। যা পরবর্তীতে আব্বাসীয় বিপ্লবের মাধ্যমেই উমাইয়া খিলাফত পতনে সহায়ক ভূমিকা রাখে। সেই কারবালায় মুহররম মানে আহলে বাইতের রক্তে রঞ্জিত দ্বীন ইসলাম”।
শহীদদের নেতা সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন আঃ বলেন,‘‘যদি মুহাম্মাদ সাঃ এর ধর্ম আমার নিহত হওয়া ছাড়া টিকে না থাকে তাহলে,এসো হে তরবারী! নাও আমাকে।’’ নিঃসন্দেহে কারবালার মর্ম বিদারী ঘটনা হলো মানব ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় ঘটে যাওয়া অজস্র ঘটনাবলীর মধ্যে সবেচেয় গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয়। এটা এমন এক বিস্ময়কর ঘটনা,যার সামনে বিশ্বের মহান চিন্তাবিদরা থমকে দাড়াতে বাধ্য হয়েছেন,পরম বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে স্তুতি-বন্দনায় মুখিরত হয়েছেন এই নজিরবিহীন আত্মত্যাগের। কারণ,কারবালার কালজয়ী বিপ্লবের মহানায়করা ‘‘অপমান আমাদের সয়না”-এই স্লোগান ধ্বনিত করে ন্যায় ও সত্য  প্রতিষ্ঠার জন্য সংখ্যায় হাতে গোনা জনাকয়েকটি হওয়া সত্ত্বেও খোদায়ী প্রেম ও শৌর্য়ে পূর্ণ টগবেগ অন্তর নিয়ে জিহাদ ও শাহাদাতের ময়দানে আবির্ভূত হন এবং প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার অধঃজগতেক পেছনে ফেলে উর্দ্ধজগতে মহান আল্লাহর সনে পাড়ি জমান। তারা স্বীয় কথা ও কাজের দ্বারা জগতবাসীকে জানিয়ে দিয়ে যান যে,‘‘যে মৃত্যু সত্যের পথে হয়,তা মধূর চেয়েও সুধাময়।’’ বিশ্বের মুসলিমদের জীবনপটে পবিত্র বিশ্বাসের পাদমূলে আশুরার সঞ্জীবনী ধারা বাহমান। কারবালার সুগভীর বারিধারা দ্বারা তৃষ্ণা নিবারণ করে আসছে প্রাণসমূহের। আজও অবধি  মূল্যবোধ,আবেগ,অনুভূতি,বিচক্ষণতা ও অভিপ্রায়ের অযুত-অজস্র সুক্ষ্ণ ও স্থুল বলয় বিদ্যমান যা আশুরার অক্ষকে ঘিরে আবর্তনশীল। প্রেমের বৃত্ত অঙ্কনের কাটা-কম্পাস স্বরূপও হলো আশুরা। নিঃসন্দেহে আশুরার মর্মকথা এবং এর চেতনা,লক্ষ্য ও শিক্ষা একটি সমৃদ্ধশালী,নিখাদ ও প্রেরণাদায়ক সংস্কৃতি গঠন করে। প্রকৃত ইসলামের সুবিস্তৃত অঙ্গনে এবং আহলে বাইতের সুহৃদ ভক্তকুল,ছোট-বড়,জ্ঞানী-মূর্খ নির্বিশেষে সর্বদা এই আশুরা সংস্কৃতির সাথেই জীবন যাপন করেছে,বিকিশত হয়েছে এবং এ জন্যে আত্মাহুতি দিয়েছে। এই সংস্কৃতির চর্চা তাদের জীবেন এত দূর প্রসারিত হয়েছে যে জন্মক্ষণে নবজাতেকর মুখে সাইয়্যেদুশ শুহাদার তুরবাত (কারাবালার মাটি ) ও ফোরাতের পানির আস্বাদ দেয় এবং দাফনের সময় কারবালার মাটি মৃতের সঙ্গে রাখে। আর জন্ম থেকে মৃত্যু অবিধও সারাজীবন হোসাইন ইবনে আলী (রাঃ) এর প্রতি ভালবাসা ও ভক্তি পোষণ করে।
উল্লেখ্য প্রিয় নূরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার পরিবার তথা আহলে বাইতকে কষ্ট দেয়া আল্লাহ ও রাসুল সাঃ কে কষ্ট দেয়া এক ও অভিন্ন। এসম্পর্ক কোরআনুল মাজিদে বর্ণনা হচ্ছে, যাহারা আল্লাহ ও তাঁর রসূল সাঃ কে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি ইহকালে ও পরকালে অভিশাপগ্রস্ত করেন এবং তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি। (সূরা আহজাব ৩৩ আয়াত ৫৭) এই বাণীর আলোকে সিদ্ধান্ত নবী প্রেমিকদের। এজিদকে নিয়ে মুসলিম পণ্ডিতদের মধ্যে নানাহ ধরণের মতানৈক্য লক্ষ্য করা যায়। কেউ বলছে এজিদ কাফির আবার কেউ বলছে কাফির নয় ফাসিক। তাকে লানত করা যাবে কি যাবেনা এনিয়েও মতবিরোধ। পণ্ডিতদের বিভক্ত মত কিন্তু সেই প্রথম থেকেই। যা সরলমনা মুসলিম উম্মাকে কঠিনভাবে বিভ্রান্ত করে। তবে এইকথা সত্য যে এজিদ নিঃসন্দেহে দ্বীন ইসলাম দ্রোহী দুশমনে রাসূল সাঃ আহলে বাইতকে হত্যাকারী জালেম পাপাচার মুনাফিক ফাসিক কাফির “লা’নাতুল্লাহি আলাইহি”। তাছাড়াও এজিদ সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন রাঃ কে হত্যাকারী উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ, শিমার ও ওমর ইবনে সা’দকে প্রমোশন দিয়েছিল কারবালার হত্যাযজ্ঞের পর। অপরাধীদেরকে শাস্তি না দিয়ে পুরস্কৃত করা কিসের আলামত?
এজিদের স্বীয় পাপিষ্ঠকাণ্ডেই প্রমাণ হয় যে, সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন রাঃ হত্যা করতে সেই আদেশ দিয়েছিল। কারণ ইমাম ছিলো তার পথের একমাত্র কাঁটা। মুসলিম পণ্ডিতদের মধ্যেই যাহারাই এজিদকে সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন রাঃ’র হত্যার নির্দেশদাতা থেকে দায়মুক্তি দিতে চেয়েছে বা চান নিশ্চিত তারা প্রকৃত ইতিহাস ও দিব্যজ্ঞান চ্যুত। সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন রাঃ কে শহীদ করার সাথে এজিদসহ যারা জড়িত তারা সবাই আল্লাহ তা’য়ালা ও তাঁর হাবীব সাঃ কে কষ্ট দিয়েছে। কাজেই তারা আর যায় হোক মুসলিম না তাদের উপর অবিরাম লা’নত।
আর সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন রাঃ’র শাহাদাতের পর মদিনার আনসার সাহাবাগণ (যাদের ভালোবাসাকে ইমান বলা হয়েছে মুসলিম শরিফের ইমান অধ্যায়ের সহিহ হাদিসে) কিংবা তাঁদের আওলাদেরা যখন পাপিষ্ঠ এজিদকে খলিফা বলে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করলেন, তখন  এজিদ একদল সৈন্য প্রেরণ করল পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারাবাসীকে শায়েস্তা করার জন্য, ওয়াল ই’য়াজুবিল্লাহ। তিন দিনের জন্য সে মদিনা শরীফে রক্তপাত, ধর্ষণ ও লুটতরাজ বৈধ বলে ঘোষণা করে দিল। হাররার ময়দানের সেই হৃদয়বিদারক যুদ্ধে অসংখ্য সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের আওলাদগণকে এজিদ বাহিনী শহীদ করে। তাঁদের স্ত্রী- কন্যাদেরকে তারা ধর্ষণ করে এবং এর ফলে অনেকের গর্ভে অবৈধ সন্তান চলে আসে। কী বলব! কলমে লেখা আসে না এই পাপিষ্ঠ কমবখত এজিদের আমলনামা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আঙ্গুল চলতে চায় না। এই জালিম সম্পর্কে কী লিখব! মসজিদে নববী শরীফকে ঘোড়ার আস্তাবল বানায় তারা। তিনদিন পর্যন্ত মসজিদে নববীতে আজান, ইকামাত ও নামাজ কিছুই হয়নি। এজিদ মক্কা- মদিনা তথা হেজাজ প্রদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাকারী শাসক। মদিনা শরীফে জন্ম নেয়া প্রথম মুহাজির মুসলিম সন্তান বিশিষ্ট সাহাবী প্রিয় নূরনবী সাঃ এর আপন ফুফাত ভাইয়ের দিকের ভাতিজা, হজরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ নাতি জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত সাহাবী হজরত জুবায়ের ইবনুল আওয়াম রাঃ ও হজরত আসমা বিনতে আবি বকর রাঃ বড়পুত্র আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাঃ বোনের ছেলে প্রিয় নবী হুজুর সাঃ এর শিংগার রক্ত পানকারী মহাসৌভাগ্যবান হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রাঃ কে শহীদ করার জন্য, তাঁকে মক্কা শরিফ থেকে উৎখাত করার জন্য নিকৃষ্ট মুসলিম ইবনে উকবাকে প্রেরণ করে মক্কা শরিফ অভিমূখে। এই নাপাক মুসলিম ইবনে উকবা হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রাঃ কে উৎখাত করতে মক্কা শরীফের পাহাড়ের উপর থেকে কাবা শরীফ অভিমুখে মিনজানিক বা আগুনের গোলা ছুড়ে। এতে কাবা শরীফের গেলাফ মুবারক জ্বলে যায়। হাজরে আসওয়াদ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় দেয়াল ধ্বসে পড়ে। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীনই মুসলিম ইবনে উকবা খবর পায় তার বদবখত মুনিব এজিদ (মদ পান করে মাতাল হয়ে নাচতে নাচতে পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে মগজ বের হয়ে মারা যায়। ইমাম জাহাবির রাহঃ এর সিয়ারু আ’লামিন নুবালা কিতাবে উল্লেখ আছে অভিশপ্ত এজিদের জীবনীতে) জাহান্নামে চলে গেছে। তখন সে মক্কা আক্রমণে বিরতি দিয়ে দামেশক অভিমূখে চলে যায় সৈন্য বাহিনী নিয়ে। পরবর্তীতে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রাঃ নতুন করে কা’বা শরীফকে হুজুর রাসূলুল্লাহ সাঃ এর ওসিয়ত ও ইচ্ছানুসারে হজরত ইব্রাহিম আ. এঁর সময়কার কা’বা শরীফের ভিত্তির উপরে পুনঃনির্মাণ করেন হাতিমে কা’বাকে কা’বার ভেতরে নিয়ে৷ হাজরে আসওয়াদকে জুড়া দিয়ে আবারো কা’বা শরীফের দেয়ালে প্রতিস্থাপন করা হয়৷ পরবর্তীতে ১০ বছর পর কুখ্যাত উমাইয়া জালিম হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ অবৈধ উমাইয়া বাদশাহ আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের আদেশে আবারো মক্কা শরীফে আক্রমণ করে আগুনের গোলা ছুড়ে কা’বা শরীফ অভিমুখে। কাবা শরীফ জ্বালিয়ে দেয় দেয়াল ভেঙ্গে পড়ে৷ হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রাঃ কে নির্মমভাবে শহীদ করে এবং দেহ মুবারাক শূলে চড়িয়ে কা’বা শরীফের সামনে ঝুলিয়ে রাখে।
এই নরাধম হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের আদেশে আবার কাবা শরিফকে জাহেলি যুগের ভিত্তির উপরে পুনঃনির্মাণ করে। পরবর্তীতে অবৈধ উমাইয়া বাদশাহ আব্দুল মালিক হুজুর রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বর্ণনার নির্ভরযোগ্যসূত্রে জেনে ফের কা’বা শরীফ নতুন করে ইব্রাহিমি ভিত্তির উপরে (হাতিমে কা’বাকে ভেতরে নিয়ে আয়তক্ষেত্রাকার করে) নির্মাণ করতে চায়, কিন্তু কিছু উলামায়ে কেরাম এতে বাঁধা দেন। তারা বলেন কা’বা শরীফকে আপনারা শাসকেরা কী খেলার সামগ্রী বানাতে চাচ্ছেন? বারবার ভাংগা গড়া করবেন? সেই সময় থেকে কা’বা শরিফ বর্তমান স্কয়ার বা বর্গাকৃতিতেই আছে। এর মাঝেও অবশ্য বেশ কয়েকবার পূনঃনির্মান হয়েছে। কাজেই এখন যে ব্যক্তি হাতিমে কা’বাতে নামাজ পড়বে সে মূলতঃ কা’বার ভেতরের অংশেই নামাজ পড়ছে।  এজন্যই এখানে নামাজ আদায় করতে মানুষ অস্থির থাকে। এটা হয়ত কা’বা শরিফের ভেতরে সাধারণ মানুষের জন্য নামাজ পড়ার এক সুযোগ আল্লাহ পাকই করে দিয়েছেন। মক্কা শরীফ ও মদিনা শরীফে রক্তপাত তো দূরের কথা, বিনা প্রয়োজনে গাছের পাতা ছেড়াও হারাম। পবিত্র নগরীর মর্যাদা দেয়া হয়েছে এই দুই নগরীকে। এজন্যই হারামাইন শরীফাইন বলা হয় এই দুই পবিত্র নগরীকে। সেই দুই শহরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল এজিদ প্রেরিত বাহিনী৷ হারাম নগরীর নিষিদ্ধ বিষয়কে যে হালাল করে সে মুসলমান থাকে কী করে? নফসের ধোঁকায় শয়তানের প্রতারণায় হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া কবিরা গোনাহ৷ কিন্তু হারাম কাজকে হালাল সাব্যস্ত করলে ইমান থাকে না এটাই প্রায় ফুকাহগণের মত। এমতাবস্থায় মক্কা ও মদিনা শরীফ এবং ঐখানকার বাসিন্দাদের সম্মান বিনষ্টকারী ও এজিদ কিভাবে মুসলমান থাকে?
কীভাবে নবী সাঃ উম্মতই নবীর সাঃ আহলে বাইতকে হত্যা করলো (!) -এ জিজ্ঞাসা সবযুগের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের। আর এ ধরনের প্রশ্ন জাগাটাও খুব স্বাভাবিক। কেননা,ইমাম হোসাইন রাঃ এর মর্মান্তিক শাহাদাত এক বিষাদময় ঘটনা কিংবা আল্লাহর পথে চরম আত্মত্যাগের এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্তই শুধু নয়,এ ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে বড়ই অদ্ভুত মনে হবে। রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর তিরোধানের মাত্র ৫০ বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। আর এ হত্যাকাণ্ডের নায়ক ছিল স্বয়ং রাসূলুল্লাহর সাঃ উম্মত যারা রাসূল এবং তার বংশকে ভালবাসে বলে ইতোমধ্যেই খ্যাতিলাভ করেছিল। তাও আবার রাসূলের সাঃ সেইসব শত্রুদের পতাকাতলে দাড়িয়ে মুসলমানরা রাসূলের সাঃ সন্তানের উপর এ হত্যাকাণ্ড চালায় যাদের সাথে কিনা রাসূলুল্লাহ সাঃ তিন-চার বছর আগ পর্যন্ত ও অব্যাহতভাবে যুদ্ধ করে গেছেন! মক্কা বিজয়ের পর যখন চারদিকে ইসলামের জয়জয়কার তখন ইসলামের ঐ চির শত্রুরাও বাধ্য হয়েই নিজেদের গায়ে ইসলামের একটা লেবেল লাগিয়ে নেয়। তাই বলে ইসলামের সাথে তাদের শত্রুতার কোনো কমিত ঘটেনি। এ প্রসঙ্গে হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসিরের উক্তিটি সুপ্রযোজ্য । তিনি বলেছিলেন,“তারা মুসলমান হয়নি,ইসলাম গ্রহনের ভান করেছিল মাত্র।” আবু সুফিয়ান প্রায় ২০ বছর যাবত রাসূলুল্লাহর সাঃ সাথে যুদ্ধ করে। শুধু তাই নয়,শেষের দিকে ৫/৬ বছর সে ইসলামের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এবং ফেতনা সৃষ্টিতে সরদারের ভূমিকা পালন করে।মোয়াবিয়া তার পিতার কাধে কাধ মিলিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুতায় নামে। এভাবে আবু সুফিয়ানের দল অর্থাৎ উমাইয়ারা ইসলামের চরমতম শত্রুতে পরিণত হয়। অথচ আমরা অত্যন্ত আশ্চর্য়ের সাথে প্রত্যক্ষ করি যে,রাসূলুল্লাহর সাঃ ওফাতের মাত্র দশবছর পরে সেই মোয়াবিয়া এসে ইসলামী শাসনযন্ত্রের শীর্ষে আরোহণ করে শাম বা সিরিয়ার গভর্ণর হয়ে বসে। আরও বিশবছর পরে ইসলামের এই শত্রু হয়ে বসলো স্বয়ং মুসলমানদের খলীফা! এখানেই শেষ নয়,রাসূলের সাঃ ওফাতেরপর পঞ্চাশ বছর পর এবার মুসলমানদের খলীফা হল মুয়াবিয়া-পুত্র এজিদ। আর এই এজিদের নামায,রোযা,হজ্ব যাকাত তথা ইসলামের বিধি-বিধান পালনকারী মুসলমানদেরকে সাথে নিয়ে অর্ধশতাব্দী গড়াতে না গড়াতেই রাসূলের সাঃ) আহলে বাইতকে হত্যা করলো। এসব নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মাথা বিগড়ে গেলেও ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঐ সব মুসলমানরা যে ইসলামকে পরিত্যাগ করেছিল তা নয়,বরং ইমাম হোসাইনের রাঃ প্রতি তাদের ভক্তির অভাব ছিল তারও কোনো প্রমাণ মেলে না। সুতরাং তাকে হত্যা করতে কোনো বাধা নেই। বরং তারা নিশ্চিতভাবে এজিদের উপর ইমাম হোসাইন (রাঃ) এর সহস্র গুণে শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদায় বিশ্বাস করতো। তাহলে এখন প্রশ্ন হল যে,প্রপ্রথমতঃ কিভাবে মুসলিম শাসন ক্ষমতা ইসলামের ঘোরশত্রু আবু সুফিয়ানের দলের হাতে পড়েলো? দ্বিতীয়তঃ যে মুসলমানরা ইমাম হোসাইন (রাঃ) এর রক্তের মূল্য যথার্থভাবে অবগত ছিল তারা কিভাবে সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইনকে রাঃ হত্যা করলো?
প্রথম প্রশ্নের জবাবে বলতে হয় যে,উমাইয়াদের মধ্যে প্রথমভাগে মুসলমান হবার গৌরব অর্জন করেছিল এবং ইসলামের প্রতি কোনো বিদ্বেষ পোষণ করতো না,বরং ইসলামের জন্যে অনেক অবদানই রেখেছিল এমন ব্যক্তির (অর্থাৎ উসমানের) খলীফা পদ লাভই ছিল এর মূল কারণ। এর ফলেই উমাইয়ারা সর্ব প্রথম মুসলিম খেলাফত লাভ করার সুযোগ পায়। আর,এ সুযোগকে ব্যাবহারকরে তারা ইসলামী শাসন ব্যাবস্থাকে নিজেদের মুলুকে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিল। স্বয়ং মারওয়ানই এর জলন্ত উদাহরণ। অবশ্য হযরত ওমরের শাসনামলেই মোয়াবিয়াকে শাম বা সিরিয়ার গভর্ণর হিসেবে নিযুক্তির মাধ্যমেইসলামি শাসনযন্ত্রে উমাইয়াদের উত্থান ঘটে। পরবর্তিতে অন্য সব গভর্ণরের পদে রদবদল করা হলেও মোয়াবিয়াকে তার পদে বহাল রাখা হয়। এটাই ছিল মুসলিম শাসন ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার মাধ্যমে উমাইয়াদের হীনতুবাসনা চরিতার্থ করণের পথে প্রথম অনুকূল ইঙ্গিত। উমাইয়ারা হযরত ওসমানের শাসন ব্যবস্থায় দুর্নীতি ছড়ায় ও গোলযোগ সৃষ্টি করে। এতে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে ওসমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং শেষ পর্যন্ত  মোয়াবিয়া তার সে লালসা পুরণের জন্য মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেল। সে নিজন্যের পক্ষ থেকে ওসমানকে ‘মজলুম খলীফা’,‘শহীদ খলীফা’ প্রভৃতি সুবিধামত স্লোগান দিয়ে প্রচারকার্য শুরু করলো এবং স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে আদাজল খেয়ে লেগে গেল। সন্দেহযরত ওসমানের রক্তভেজা জামা সবার সামনে মেলে ধরে তার মজলুমস্তকে গতিশীল রূপ দেয় এবং বলে বেড়ায়,‘যেহেতু উসমানের হত্যার পর আলী (রাঃ) খলীফা হয়েছেন,তাছাড়া উসমানের হত্যাকারীদেরকে তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন- সুতরাং উসমান হত্যার জন্য মূলতঃ আলীই রাঃ দায়ী।’ এই বলে সে অভিনয়ের স্বরে কাঁদতে থাকে যাতে মানুষের অনুভূতিকে আকৃষ্ট করতে পারে। তার এঅপপ্রচেষ্টা সফলও হয়। কারণ,তার কান্নার সাথে সুর মিলিয়ে অনেকেই চোখের পানি ঝরায় ও শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে মজলুম খলীফার রক্তের প্রতিশোধ নিতে যেই কথা-সেই কাজ-এই রুপে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। তারা মুয়াবিয়াকে আশ্বাস দেয়ঃ আমরা প্রস্তুত আছি,তুমি যা বলবে তাই আমরা পালন করতে রাজী আছি। এভাবে পদলোভী স্বার্থপর মুয়াবিয়া স্বয়ং মুসলমানদেরকে নিয়েই ইসলামের বিরুদ্ধে বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলে। ইসলামের ঊষালগ্নের প্রহেলিকাময় ঘটনাবলী এবং নবী সাঃ এর উম্মতের হাতে নবীর সাঃ বাইতের হত্যার কারণে ইতিহাসে বেশকিছু বিস্ময়কর ও নজিরবিহীন ঘটনা রয়েছে যেগুলোর কারণ এবং সূত্র  খুজতে গিয়ে অনেকেই হয়তো বিপাকে পড়েত পারেন। এগুলোর মধ্যে একটি হল ইসলামের উষালগ্নেই সমসাময়িক অন্যান্য মতামত এবং আকীদা-বিশ্বাসকে দাবিয়ে এর বেপরোয়া প্রসার। আরকটি ঘটনা হল ইমাম হোসাইনের রাঃ আন্দোলন এবং বিদ্রোহ। আত্মীয়-অনাত্মীয়,চেনা-অচেনা নির্বিশেষে সবাই কুকুফার লোকদের বিশ্বাসঘাতকতার ইস্যু টেনে ইমাম হোসাইন রাঃ কে বিরত রাখতে চেষ্টা করছিল। তারা যে ইমাম হোসাইনের রাঃ জীবনের নিরাপত্তারক্ষকথা ভেবেই এ চেষ্টা চালিয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রহস্যের বিষয় হল যে,ইমাম হোসাইনও রাঃ তাদের চিন্তাধারাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেননি। অথচ মক্কা,কারবালা এবং কুকুফার পথে তার বিভিন্ন ভাষ্য থেকে প্রপ্রতীয়মান হয় যে,ইমাম হোসাইনের রাঃ ও একটা স্বতন্ত্র চিন্তাধারা ছিল যা অনেক ব্যাপক ও দূরদর্শী। তার হিতাকাঙ্খীদের ভাবনা কেবল নিজন্যের এবং পরিবার-পরিজনদের নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। অথচ,ইমাম হোসাইনের রাঃ চিন্তা দীন,ঈমান ও আকীদার নিরাপত্তাকে নিয়ে। তাই,মারওয়ানের এক নসীহতের জবাবে ইমাম হোসাইন রাঃ বলেন,‘এজিদের মতো কেউ যদি উম্মতের শাসক হয় তাহলে এখানেই ইসলামের ক্ষান্তি ।’’
মুয়াবিয়া ও এজিদের ইসলামি শাসন ক্ষমতা লাভ এবং ইসলামে অবিচল মুসলমানদের নিয়ে যথাক্রমে হযরত আলী আঃ এবং সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন রাঃ এর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী গঠন ছিল ইসলামের উষালগ্নের প্রহেলিকাময় ঘটনাবলীর অন্যতম। এখানে দুটি বিষয়কে খতিয়ে দেখা দরকার। তাহলেই সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইনের রাঃ সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা,এর কারণ,লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য উদঘাটন করা আমাদের পক্ষে সহজতর হবে। প্রথমতঃ আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে ইসলাম ও কুরআনের সাথে উমাইয়া বংশের তীব্র সংঘাত এবং দ্বিতীয়তঃ ইসলামি শাসন ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে তাদের সফলতা। ইসলামের সাথে উমাইয়াদের এহেন শত্রুতাসুলভ আচরণের কারণ হল যে,একাদিক্রমে তিন বংশ ধরে বিন হাশিম ও বনি উমাইয়ার মধ্যে গোষ্ঠীগত কোন্দল চলে আসছিল। অতঃপর যখন বিন হাশিম ইসলাম ও কুরআনের ধারক ও বাহক হবার গৌরব লাভ করে তখন বনি উমাইয়ারা ঈর্ষায় পুড়ে মরতে থাকে। ফলতঃ তারা বিন হাশিমকে সহ্র করতে পারলো না,সাথে সাথে ইসলাম ও  কুকুরআনকেও না। দ্বিতীয় কারণ হলঃ তৎকালীন কোরাইশ গোত্রের নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে উমাইয়াদের পার্থিব জীবনধারার সাথে ইসলামী বিধানের অসামঞ্জস্য ও বৈপরিত । এতে তাদের প্রভূত্বমূলকলক প্রভাব ক্ষুণ্ন হয়। তাদের  ভাব ও মন-মানস ছিল সুবিধাবাদী ও বস্তুবাদী। উমাইয়াদের যথেষ্ট বুদ্ধি থাকেলও তাদের ঐ বস্তবাদী মানসিকতার কারণে খোদায়ী বিধান থেকে তারা উপকৃত হতে পারেনি। কারণ ঐশী শিক্ষাকে সে-ই অবনত মস্তকে  গ্রহণ করতে পারে যার মধ্যে মর্যাদাবোধ,উম্মত আত্মা এবং মহত্বের আনাগোনা রয়েছে এবং যার মধ্যে সচেতনতা ও সত্যান্বেষী মনোবৃত্তি নিহিত আছে। অথচ উমাইয়ারা অতিশয় দুনিয়া চর্চা করতে করতে এসব গুণগুলোর সব ক’টি হারিয়ে বসেছিল। অগত্যা তারা ইসলামের সাথে শত্রুতায় নেমে পড়ে। পবিত্র কুরআনেও এ দিকটির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সত্যকে মেনে নেবার সক্ষমতা যাদের আছে তাদেরকে ইশারা করে কুরআনে বলা হয়েছেঃ “যাতে তিনি (রাসূল) সচেতনদের সতর্ক করতে পারেন।’’ (ইয়াসীনঃ ৭০) কেবল তাদেরকেই সতর্ক করো যারা উপদেশ মেনে চলে’। (ইয়াসীনঃ ১১) ‘আমরা কুরআন অবতীর্ণ করি,যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত। আর তা জালেমদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।’ (বনী ইসরাঈল ৮) ‘এটি এজন্য যে,আল্লাহ কুজনদেরকে সুজন হতে পৃথক করবেন।’ (আনফাল ৪৮)
 মূলকথা,আল্লাহর রহমত থেকে তারাই উপকৃত হতে পারবে যাদের প্রস্তুতি ও যোগ্যতা রয়েছে। এটি একটি খোদায়ী নীতি। আর উমাইয়াদের মধ্যে সে প্রস্তুতি না থাকায় তারা ইসলাম এবং কুরআনের অমিয় সুধা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়।
রাসূলের সাঃ চাচা হযরত আব্বাস এবং আবু সুফিয়ানের মধ্যে এক সাক্ষাতে তাদের মধ্যকারক্ষকথোপকথন থেকে আবু সুফিয়ানের নিরেট ও অন্ধ আত্মার প্রকাশ ঘটে। কিন্তু উমাইয়া দল কিভাবে চিরকাল শত্রুতা করেও হঠাৎ করে একটা তৎপর ইসলামী দল হিসাবে আত্ম প্রকাশ করলো- উপরন্তু তারা ইসলামের শাসন ক্ষমতাকে নিজেদের কুক্ষিগত করতে সক্ষম হলো? এ প্রশ্নের জবাবের শুরু তে একটা বিষয় উল্যেখ্য । তাহলো-নবনির্মিত ও নব প্রতিষ্ঠিত কোনো জাতি হঠাৎ করেই শক্তিশালী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে না,চাই সে ঐক্য যত শক্তিশালীই হোক না কেন।
একটু চিন্তা করলে আমাদের সামনে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হবে যে,আরবে নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্টের ভিত মজবুত হতে না হতেই বিশেষ করে দ্বিতীয় খলীফার আমলে বেপরোয়াভাবে দেশজয় করে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটানো হয়। প্রকৃতপক্ষে তাড়াহুড়া করে নতুন নতুন দেশজয় করে ইসলাম প্রসারের চেয়ে বরং ধৈর্য ধরলে ইসলাম তার স্বাভাবিক গতিতে সীমান্ত অতিক্রমস্তকরে দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়তো-এটাই কি অধিকতর সমীচীন ছিল না? ঐ তাড়াহুড়ার পিরণাম হিসাবে আমরা পরবর্তিতে দেখতে পাই মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিদ্যমান এসব -দ্বন্দ বিভেদ। প্রাথমিক যুগে ইসলাম প্রসারে ঐ বেপরোয়া নীতির ফলশ্রুতিতে প্রথমতঃ একটা অসমত্ব মুসলিম  সাম্রাজ্যের উদ্ভব হয় এবং দ্বিতীয়তঃ তা আরবের ইসলামী সংস্কৃতিতে অনারব ও অনৈসলামী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের পথ খুলে দেয়। ফলে অতি শীঘ্যই আরব তার স্বাতন্ত্র ও ইসলামী সাংস্কৃতিকে হারিয়ে ফেলে।
সেদিনকার নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাষ্ট ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর পতাকা তলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল বটে এবং জাতি-বর্ণের ব্যবধানকে দ্রুত মুছে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল বটে কিন্তু বিভিন্ন গোত্র,ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ, রীতি-নীতি আদব-কায়দা এবং ভিন্ন আকীদার বিশ্বাসে গড়ে ওঠা মানুষগুলোর দ্বীন ও দ্বীনের আইন-কানুন মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে সমান যোগ্যতা ও প্রস্তুতি ছিল না। এই পণ্ডিত জনসমষ্টিকে বছরের পর বছর তথা শতাব্দীর পর শতাব্দী অবিধ একটা নির্দিষ্ট সাম্রাজ্যের শাসনাধীনে ধরে রাখা সহজ কথা নয়। পবিত্রকুরআন একাধিকবার মোনাফিকদেরক্ষকথা উল্লেখ করেছে। মোনাফিকদের ব্যাপারে সতর্ক করার ধরন দেখে বোঝা যায় যে,এরা মারাত্মক। কুরআন মুসলমানদেরকে এই গুরুতর বিপদ থেকে রক্ষা করতে চায়। আব্দুল্লাহ ইবনে সালুল মদীনার মুনাফিকদের শীর্ষে ছিল। কুরআন ‘মুয়াল্লাফাতু কুলুবুহুম’ একথা উল্লেখ আছে যে, যারা দায়ে পড়ে কিংবা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় মুসলমানের তালিকায় নিজেদের নাম লিখিয়েছে। যাহোক,তারা যাতে আস্তে আস্তে খাটি মুসলমান হতে পারে সেদিকে তাদেরকে উৎসাহিত করা উচিত। বায়তুলমাল থেকে তাদেরকে সাহায্য করতে হবে যাতে অন্ততপক্ষে তাদের অনাগত বংশধররা খাটি মুসলমান হয়ে গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু তাই বলে তাদেরকে গুরুত্ব কোনো পদে নিয়োগ করা মারাত্মক ভুল। রাসূলুল্লাহ সাঃ তার দয়া ও সদাচরণ থেকে কাউেক বঞ্চিত করতেন না। এমন কি মোনাফিক এবং ‘মুয়াল্লাফাতু কুলুবুহুম’ দেরকেও না। কিন্তু তাদের প্রতি সতর্কাবস্থা তিনি কখনই বর্জন করেননি। আর এ কারণেই রাসূলুল্লাহর সাঃ জীবদ্দশায় কোনো দুর্বল ঈমানদার,মুয়াল্লাফাতু কুলুবুহুম কিংবা মোনাফিক উমাইয়াদের কেউই ইসলামী শাসনযন্ত্রের ধারে কাছেও ঘেষতে পারেনি। অথচ অত্যন্ত পিরতাপরে বিষয় হল,রাসূলের সাঃ এর ওফাতের পর থেকে বিশেষ করে হযরত ওসমানের আমলে তারাই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো কুক্ষিগত করে। রাসূল সাঃ জীবদ্দশায় মারওয়ান ও তার বাবা হাকাম মক্কা ও মদীনা থেকে নির্বাসন প্রাপ্ত হয়েছিল। কিন্তু এ সময় তারা ফিরে আসার সুযোগ লাভ করলো। গত দুই খলীফার আমলেও তাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসা সংক্রান্ত হযরত ওসমানের অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত  ঐ মারওয়ানই ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি ও হযরত উসমান হত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
লক্ষণীয় বিষয় হলো হযরত উসমান রাঃ’র সময়েই উমাইয়ারা বড় বড় পদে আসীন এবং বায়তুল মালে হস্তক্ষেপ করে। ফলে হযরত উসমান রাঃ’র হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে অদ্ভুত এক প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির মাধ্যমে ‘ধার্মিক’ হবার গৌরবটাও তারা হাতে পায় এবং সেটাকেও তাদের লক্ষ্য চরিতার্থ করার কাজে নিয়োগ করে। আর এর বদৌলতেই মুয়াবিয়া দ্বীন ইসলাম রক্ষার ও শক্তি অর্জনের নামে হযরত আলীর রাঃ এর বিরুদ্ধে বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করতে সক্ষম হয়। এরপর থেকে মুয়াবিয়া কথিত বাহ্যিদর্শী আলেমদেরকে ভাড়া করে এনে আরও একটা কৃতিত্ব দেখায়। অর্থাৎ সে চারটি বিষয় অস্ত্র হিসাবে ব্যাবহার করে মুসলমানদের শাসনমঞ্চে আবির্ভূত হয়। যথা, (১) বড় বড় রাজনৈতিক পদ (২) ধন-দৌলতের প্রাচুর্য (৩) অতিমাত্রায় ধার্মিকতা এবং (৪) কথিত আলেম।
হযরত উসমানের যুগে উমাইয়াদের রাজনৈতিক উত্থান এবং বায়তুলমালের ছড়াছিড় দেখে দ্বীনদার এবং দুদুনিয়াদার উভয়পক্ষই ক্ষেপে ওঠে। দুনিয়াদাররা তাদের চোখের সামনে উমাইয়াদের ভোগ-বিলাস সহ্য করতে পারেনি কারণ তারা তাদের নিজেদের স্বার্থের ব্যাপারে অনেক সচেতন ছিল। আর দ্বীনদাররা দেখিছল যে,ইসলামি সমাজের আশু ধ্বংস অনিবার্য। এ কারণেই দেখা যায় যে,আমর ইবনে আস রাঃ যেমন এর বিরোধিতায় নামে তেমনি আবুজর রাঃ বা আম্মার রাঃও এর বিরোধিতা করেন। আমর ইবনে আস রাঃ বলেঃ ‘আমি এমন কোনো রাখালের পার্শ্ব অতিক্রমস্তকরিনি যাকে উসমানের হত্যার জন্যে উস্কানি দেই নি’। হযরত আলী রাঃ জামালের যুদ্ধে বলেনঃ সাইয়্যেদিনা ‘উসমান রাঃ কে হত্যা করতে আমাদের মধ্যে যারা অগ্রণী ছিল আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ দিক।’ যখন হযরত উসমান রাঃ অবরোধ্যের মধ্যে ছিলেন, তখন হযরত আলী রাঃ তাকে বিভিন্ন প্রকারের উপদেশ ও দিক-নির্দেশনার পাশাপাশি তাকে খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ করেছেন। কিন্তু মুয়াবিয়াই এইসকল ফেতনা-ফ্যাসাদের সূচনা ও পরিণতি সম্বন্ধে অবগত ছিল। তাই হযরত উসমান রাঃ তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেও মুয়াবিয়া তার বিশাল বাহিনী নিয়ে শামেই বসে থাকলো। কারণ সে বুঝেছিল যে,জীবিত উসমানের চেয়ে মৃতঃ উসমানই তার জন্যে অধিক সুবিধাদার। তারপর যখন হযরত উসমান রাঃ’র হত্যার খবর শুনলো    খন হায় সমান! হায় উসমান! বলে চীৎকার করে উঠলো। হযরত উসমানের রক্ত ভেজা জামা লাঠির মাথায় করে ঘুরালো,মিম্বারে বসে শোক গাঁথা গেয়ে যেমন কাঁদলো তেমনি অজস্র মানুষের চোখের পানি ঝরালো,আর কুরআনের এই আয়াত নিজের স্লোগানে পরিণত করেল ‘যে মজলুম অবস্থায় নিহত হয় তার উত্তরসুরিকে আমরা কর্তৃত্ব দান করেছি’ (বনী ইসরাইলঃ ৪৪) ফলে উসমানের রক্তের বদলা নেয়ার জন্যে মুয়াবিয়া ধন-দৌলত ও সরকারী পদগুলোর সাথে ধার্মিকতাকেও যুক্ত করতে সক্ষম হয় এবং ইসলামি সাম্রাজ্যের একটা বড় অংশের অধিকর্তা হয়ে বসে। অন্যকথায়,ধার্মিকতার শক্তিকে রাজনীতি ও ধন-দৌলতের সাথে যোগ করে জনগণ তথা হযরত আলীর (রাঃ) অনুসারীদেরকে সংকটাবস্থানে নিক্ষেপ করে। তাদেরকে বস্তুগত দিক থেকেও যেমন সংকটে ফেলে তেমনি আত্মিক ও মানিসকভাবেও। অবশ্য শুধুমাত্র ধার্মিকতা মজলুমের পক্ষ হয়েই অগ্রসর হয়। কিন্তু যদি জনগণের অজ্ঞতা এবং ক্ষমতাসীনদের প্রতারণার বলে দ্বীনদারী রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয় তাহলে আর দুর্দশার শেষ নেই। আল্লাহ আমাদেরকে সেদিনের হাত থেকে বাঁচান যেদিন দ্বীন রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হবে। এই ছিল ইসলামি খেলাফত লাভ ও আলেম সমাজের উপর মুয়াবিয়ারক্ষকর্তৃত্ব লাভ করার সংক্ষিপ্ত কাহিনী,যা তিনটি জিনিসের সমন্বয়ে সম্ভব হয়েছিল। যথাঃ উমাইয়াদের,বিশেষ করে মুয়াবিয়ার কুটবুদ্ধি,পূর্ববর্তী খলীফাদের (ভ্রষ্ট) নীতি যারা এদেরকে ইসলামি শাসন ব্যবস্থায় স্থান দিয়েছিলো আর জনগণের অজ্ঞতা ও মূর্খতা।
মুয়াবিয়া তথা উমাইয়ারা দুটো বিষয়েক কেন্দ্র করে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্যে অধিক প্রচেষ্টা চালায়ঃ (১) জাতি ব্যব্যবধান সৃষ্টি যার ভিত্তিতে আরব,অনারেবর চেয়ে অগ্রগণ্য বলে বিবেচিত হতো। (২) গো ব্যবধান সৃষ্টি যার ভিত্তিতে আব্দুর রহমান ইবনে আউফের মতো লোকেরা লাখপিত হয় অথচ ফকীররা ফকীরই থেকে যায়। আলী রাঃ দুনিয়া ত্যাগ করলে মোয়াবিয়া খলীফা হয়। কিন্তু আশ্চর্য়ের সাথে সে দেখতে পেল যে,তার ধারণাকে বদলে দিয়ে পরেও হযরত আলী রাঃ একটা শক্তি হয়েই বহাল রয়ে গেছেন। মুয়াবিয়ার ভাবলক্ষণ দেখে বোঝা যেত যে,এ কারণে সে বড়ই উদ্বিগ্ন ছিল। তাই মোয়াবিয়া হযরত আলীর (আঃ) বিরুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডার যুদ্ধে নামে। আদেশ  জারী করা হলো যে,মিম্বারে এবং খোতবায় হযরত আলী রাঃ কে অভিশাপ দিতে হবে। হযরত আলীর রাঃ অন্যতম সমর্থকদেরকে বেপরোয়া হত্যা করা হলো এবং বলা হলো যে,প্রয়োজনে মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করে হলেও তাদেরকে বন্দী করবে যাতে হযরত আলীর রাঃ গুণ-মর্যাদা প্রচার না হয়। পয়সা খরচ করে হযরত আলীর রাঃ শানে বর্ণিত হাদীসসমূহ জাল করে উমাইয়াদের পক্ষে বর্ণনা করা হয়। তবুও বরাবরই উমাইয়া শাসনের জন্যে হযরত আলীর সমর্থকরা একটা হুমকি হিসাবে আত্মপ্রকাশকরে। উমাইয়া শাসনামলের বিশ্লেষণ আমাদেরকে কেবল বিস্ময়াভিভূতই করে না বরং আমাদের জন্যে দিক নির্দেশনা বের হয়ে আসে। এটা যেনেতন কোনো ব্যাপার নয় যে,চৌদ্দশ’ বছর আগের ঘটনা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কি লাভ বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাব। কারণ,চৌদ্দশবছর আগের ইতিহাসের ঐ খণ্ড অধ্যায়ে ইসলামের মধ্যে যে বিষক্রিয়া সংক্রমিত হয়েছিল তা থেকে মুক্তির আশা সুদূর পরাহত। তাই এ নিয়ে গবেষণা করলে বরং আমাদের লাভ ছাড়া কোনো ক্ষতি নেই। উমাইয়াদের ঐ বিষাক্ত চিন্তার উপকরণেক ইসলামী চিন্তাধারার সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। ইসলামের খাঁটি রূপ দেখতে হলে এসব ভেজাল উপকরণের অপসারণ দরকার। খোদা না করুন,আজ আমরা যারা দিবারাত্রি উমাইয়াদের গালি দেই তাদের মধ্যেও হয়তো উমাইয়া চিন্তাধারা বিদ্যমান। অথচ আমরা তাকে একবারে বিশুদ্ধ ইসলাম বলে মনে করি। মুয়াবিয়া যখন দুনিয়া ত্যাগ করে তখন ইতোমধ্যে সংযোজিত কিছু বিদআত প্রথার সাথে আরও কয়েকটি প্রথার চলন করে যায়। যেমন (১)হযরত আলীকে রাঃ অহরহ অভিসম্পাত করা। (২)টাকার বিনিময়ে হযরত আলীর রাঃ বিরুদ্ধে হাদীস জাল করা। (৩) প্রথমবারের মতো ইসলামী সমাজন্যে বিনাদোষে হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করার অবাধ নীতি চালু করা। এছাড়া সম্মানীয়দের সম্মান খর্ব করা এবং হাত-পা কেটে বিকল করে দেয়া। (৪)বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা। যে প্রথা পরবর্তী খলীফারাও অস্ত্র হিসাবে ব্যাবহারকরে। এসব অমানবিক প্রথার চলন মোয়াবিয়াই চালু করে যায়। সে ইমাম হাসান রাঃ, মালেক আশতার,সা’দ ইবনে ওয়াক্কাছ প্রমুখকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। (৫) খিলাফতকে নিজন্যের খান্দানে আবদ্ধ রেখে রাজতন্ত্র প্রথা চালু করা এবং ইয়াযিদের মতো অযোগ্য ব্যক্তিকেও খলীফা পদে মনোনীত করা।(৬) গোত্র বৈষম্যের স্তিমিতপ্রায় আগুনকে পুনরায় অগ্নিবৎ করা। এগুলোর মধ্যে হযরত আলীকে রাঃ অভিসম্পাত করা,হাদীস জাল করা এবং এজিদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ ছিল মুয়াবিয়ার কার্যকলাপের অন্যতম।
এজিদ ছিলো একেবারেই মূর্খ, নির্বোধ ও দুষ্ট।  ইতিহাসের পাতায় দেখা যায় সাধারণত খলীফার পুত্রদের মধ্যে যাকে খলীফা হিসাবে মনোনীত করা হতো তাকে বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হতো। বিষেশ করে যা আব্বাসীয়দের মধ্যে পাওয়া যায়। কিন্তু এজিদ তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সে সবসময় মরুভূমিতে আনন্দ ফূর্তীতে রাজকীয় বিলাসিতায় দিন অতিবাহিত করতো । দ্বীন-ধর্মের চর্চার কথা তো প্রশ্নই আসেনা! সারকথা মুসলিম উম্মার খলীফা হবার বিন্দুমাত্র যোগ্যতাও তার ছিলনা। উল্লেখ থাকে যে, সাইয়্যেদিনা উসমান রাঃ এর সরলতার সুযোগে বায়তুলমালের লুন্ঠনসহ বড় বড় পদগুলোতে অযোগ্যরা পদায়িত হয়ে ছিলো। যার ফলে মুয়াবিয়া হযরত আলীর রাঃ বিরুদ্ধে অভিসম্পাত দেয়া,হাদীস জাল করা,বিনা দোষে হত্যা,বিষ প্রয়োগ,খেলাফতকে রাজতন্ত্রে রুপান্তরিত করা প্রভৃতি প্রথা চালু করে। এজিদের সনয় এসে ইসলাম আরো চরমভাবে পর্যদস্তু হয়। দেশ-বিদেশের দূতরাও এসে সরাসরি এজিদের কাছে যেতো। মানুষ অবাক হয়ে দেখতো যে,রাসূলুল্লাহর সাঃ আসনে এমন একজন বসে আছে যার হাতে মদের বোতল,আর পাশে বসিয়ে রেখেছে রেশমী কাপড় পরা নারী। এরপরেও ইসলামের মর্যাদা আর কি থাকতে পারে? এজিদ ছিল অহংকারী,যৌবনের পাগল,ক্ষমতালোভী এবং মদ্যপানী। এ কারণেই সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন রাঃ বলেছিলেনঃ ‘যদি ইয়াযিদের মতো দুর্ভাগা উম্মতের শাসক হয় তাহলে এখানেই ইসলামের ইতি টানেত হবে। ইয়াযিদ প্রকাশ্যে খোদাদ্রোহিতায় নামে। অন্য কথায়,এতোদিনের গোপনতার পর্দা ছিন্ন করে ইয়াযিদ উমাইয়াদের আসল চেহারাটা প্রকাশকরে দেয়। ইসলাম যদি জিহাদ করার আদেশ  দিয়ে থাকে-যদি অন্যায়ের গলা চেপে ধরার আদেশ  দিয়ে থাকে তাহলে এটাই ছিল তা পালনের সর্বোৎকৃষ্ট সময়। তা নাহলে,এরপর আর কি নিয়ে ইসলামের দাবী উত্থাপন করার থাকে? কাজেই,যদি কেউ প্রশ্ন করে যে,ইমাম হোসাইন (আঃ) কেন বিদ্রোহ করতে গেলেন তাহলে একই সাথে তার এ প্রশ্নও করা উচিত যে,রাসূলুল্লাহ রাঃ কেন আপোষহীন বিদ্রোহ করেছিলেন ? কিংবা,হযরত ইবরাহীম রাঃ কেন একা হয়েও নমরুদের বিশাল শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন? আর কেনই বা হযরত মূসা আঃ এর একমাত্র সহযোগী ভ্রাতা হারুণকে নিয়ে ফেরাউেনর রাজ প্রাসাদে দাড়িয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন? এসবের জবাব খুবই স্পষ্ট যা ব্যাখ্যা করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়না। খোদাদ্রোহিতা ও মানবতাবিরোধীতাকে সমূলে উৎপাটন করাই ছিল এসব কালজয়ী মহা-আত্মাদের মূল লক্ষ্য ওউদ্দেশ্য । আর এগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে বস্তুগত সাজ-সরঞ্জাম না হলেও চলে। কারণ স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালাই তাদের সহায়। তাই সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন রাঃও উমাইয়াদের খোদাদ্রোহিতা এবং এজিদী বিচ্যুতিকে ধুলিসাৎ করে দেবার জন্যেই একবারে অসহায় অবস্থায় পড়েও বিদ্রোহ করেন। প্রকৃতপক্ষে তার এ পদক্ষেপ ছিল পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলদেরই অনুকরণ ও অনুশীলন। বুদ্ধিজীবীদের মতে,বিদ্রোহ তখনই মানায় যখন বিদ্রোহীদের অন্ততপক্ষে সমান সাজ-সরঞ্জাম এবং শক্তি থাকে। কিন্তু ,ঐশী-পুরুষদের বেলায় আমরা এই যুক্তির কোনো প্রতিফলন দেখি না। বরং তারা সবাই একবারে খালি হাতে তৎকালীন সর্ববৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। ইমাম হোসাইন রাঃ ও এ নিয়মের ব্যতিক্রম নন। তাছাড়া ইমাম হোসাইন রাঃ যদি সেদিন ইয়াযিদ বাহিনীর সমান এক বাহিনী নিয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হতেন তাহলে তার এ অসামান্য বিপ্লব ঐশী দ্যুতি হারিয়ে অতি নিস্প্রভ হয়ে পড়তো। এই দর্শন প্রতিটি ঐশী বিপ্লবের মধ্যেই বিদ্যমান ছিল।
মানবিক সমাজ গঠনের জন্য পৃথিবীতে আবির্ভূত পবিত্র সত্তাসমূহ অজস্র সংগ্রাম করেছে। ঐশী সংগ্রামগুলোকে দুটিভাবে দেখা যায় বিপ্লবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বিচার বিশ্লেষণে। যথা (১) মানুষের মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করে উন্নত ও উত্তমস্ত করা। অর্থাৎ মানবতার মুক্তি, একত্ববাদ ও  ন্যায়পরায়ণতাকে রক্ষা, জুলুম ও স্বৈরাচারণের মূলোৎপাটন করে মজলুমের অধিকার ফিরিয়ে দেবার বিপ্লব। যাহা জায়গা-জমি দখল বা পদের লোভ কিংবা গোষ্ঠীগত অথবা জাতিগত বিদ্বেষে  নয়। (২) এসব বিপ্লবের উদ্ভব হয় স্ফুলিঙ্গের মতো। অর্থাৎ চারিদিকে যখন নিপীড়ন, অত্যাচার জুলুম ও স্বৈরাচারিতার ঘন অন্ধকারে মানুষ নিমজ্জিত হয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই অন্ধকারের বুক চিরে বারুদের মতো জ্বলে ওঠে বিপ্লবের আগুন। চরম দুর্দশায় নিমজ্জিত হয়ে মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে পড়ে তখন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো মানুষের ভাগ্যাকাশে আশার প্রদীপও জ্বালিয়ে দেয় ঐশী বিপ্লব। চরম দুর্দিনে মানবতাকে মুক্তি দেয়ার মতো দূরদর্শিতা একমাত্র ঐশী পবিত্র আত্মাসমূহেরই হয়প থাকে। সাধারণ মানুষ কিন্তু অপরাধের প্রতিরোধে বা প্রতিকারে উদ্যোগী হয়ে উঠেনা, কেউ মানবতা ও ধর্মবিরোধী অপকর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রয়াস চালালে তাতেও সমর্থন দিতে চায় না। এমন ধরণের অবস্থা ইতিহাসের আলোকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইনের রাঃ বিপ্লবের মধ্যেও লক্ষণীয় । ইমাম যখন এজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলো তখন সমসাময়িক তথাকিথত বুদ্ধিজীবী এবং মুসলিম পণ্ডিতরাও এটাকে অবাস্তব বিষয় বলে ধারণা পোষণ করলো । একারণে তাদের অনেকেই সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইনের রাঃ সাথে একাত্মতা প্রকাশে বিব্রত হয়। কিন্তু সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন রাঃ ভালোভাবে বুঝতেন যে,এ মুহূর্তে কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। তাই তিনি অন্য কেউ সহযোগিতা করবে কি করবেনা সেদিকে নজর না করে নবী-রাসূলদের ন্যায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে আগুনের ফুলিকর মতো জ্বলে উঠেলন। হযরত আলী রাঃ বনী উমাইয়াদের ধূর্তামী সম্পর্কে বলতেন, “উমাইয়ারা নিরেট ধোঁকাবাজ ও প্রতারক ।’’ তাই সাইয়্যেদিনা ইমাম হোসাইন রাঃ এজিদের অন্ধকার থেকে উম্মতে মুহাম্মদী সাঃ কে মুক্ত করার জন্যে ইতিহাসের বিরল অবিস্মরণীয় এই বিপ্লবের পথ বেছে নেন।
লেখকঃ মুফতী মাসুম বিল্লাহ নাফিয়ী- প্রধান সমন্বয়ক, বাংলাদেশ সোস্যাল অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম।

Comments

comments

Please Share This Post in Your Social Media

© 2018-2021, daynikekusherbani.com- All rights reserved.অত্র সাইটের কোন - নিউজ , ভিডিও ,অডিও , অনুমতি ছাড়া কপি/ অন্য কোথাও ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।
Design by Raytahost.com